রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:১২ অপরাহ্ন

রাজশাহী কারা হাসপাতাল অনিয়মই যেখানে নিয়ম, টাকা দিলেই মেলে নানা সুবিধা

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী:
রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার। এই কারা হাসপাতালে নানা অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কারা হাসপাতালে অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্তদের দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করলেই মেলে নানা ধরণের সুযোগ সুবিধা। কারা কর্তৃপক্ষ নানা অনিয়মের অভিযোগ জেনেও না জানার ভান করে। কর্তৃপক্ষের গাফেলতি ও অবহেলার কারণে বছরের পর বছর ধরেই জিইয়ে রয়েছে নানা অনিয়ম। আর এর মাশুল গুণতে হচ্ছে অসহায় ও নিম্নবিত্ত পরিবারের হাজতি ও কয়েদীদের।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রতি মাসে কোনো হাজতি ৬ হাজার টাকা পরিশোধ করলেই রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতালে পান বেড। হাসপাতালের বেড পেতে হলে অসুস্থ হওয়া জরুরী নয়। কোনো নিয়ম বা বিধি অনুসরণেরও প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ টাকা দিলেই হাজতিদের দেওয়া হয় বেড। আর অসুস্থ হাজতিরা কম্বল বিছিয়ে থাকেন মেঝেতে। কনকনে শীতেও তারা বেড পান না। সূত্রটি আরো জানায়, সপ্তাহে দুইদিন সিনিয়র জেলসুপার হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তখন বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে অচল, বৃদ্ধ, রুগ্ন ও অসুস্থ হাজতিদের এনে মেডিকেলের ড্রেস পরিয়ে বেডে বসানো হয়। আর সুস্থ হাজতিদের বেড থেকে সরিয়ে দেয়া হয় সাধারণ ওয়ার্ডে। তবে এসব অনিয়ম সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে সিনিয়র জেলসুপারের পরিদর্শনের আগেই কয়েদী ইনচার্জ (সিও ম্যাড), রাইটার, সেবক এবং ফার্মাসিস্টরা অসুস্থ হাজতিদের কিছু কথা শিখিয়ে দেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সিনিয়র জেলসুপার জিজ্ঞাসা করলেই বলতে হবে আমি এই বেডেই থাকি। খাওয়া, চিকিৎসা ভাল হচ্ছে। আমার কোন অসুবিধা নেই।
সূত্রটি বলছে, যতই শিখিয়ে দেয়া হোক না কেন, সিনিয়র জেলসুপার ঠিকই জানেন যে, এ ধরণের অনিয়ম এখানে অহরহই ঘটে। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সিনিয়র জেলসুপারের পরিদর্শন শেষে আবার সুস্থ হাজতিদের বেডে ফিরিয়ে আনা হয়। কারা হাসপাতালে থাকা, খাওয়া, গল্প করা, গোসল করা, আড্ডা দেওয়া, তাস খেলা, টিভি দেখাসহ প্রয়োজনীয় প্রায় সব সুবিধাই মেলে এখানে। কারা হাসপাতাল যেন টাকা ওয়ালা হাজতি-আসামিদের (প্রতারক, সন্ত্রাসী, মাদক কারবারীসহ নানা অনৈতিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত) থ্রি স্টার বা ফাইভ স্টার হোটেল। আবার কোনো কোনো হাজতিকে ব্যাডমিণ্টন খেলার সুযোগ করিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অপর একটি সূত্র জানায়, কারা হাসপাতালে অভিযোগগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে- বন্দী বেচাকেনা, সাক্ষাৎ ও জামিন বাণিজ্য প্রভৃতি। অভিযুক্তদের মধ্যে এই কারাগারের সুবেদার, জেলার, সিনিয়র জেলসুপার, কারা হাসপাতালের চিকিৎসক, ফার্মাসিস্টরা জড়িত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, এর আগে কারাগারের ক্যানটিনে অনিয়ম, বিধি না মেনে ভুয়া বিল-ভাউচার বানিয়ে খরচ দেখিয়ে সেই টাকা তুলে নেওয়া, কারাগারে বিক্রি হয় এমন পণ্যের মধ্যে অধিকাংশ পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া খাবারের মান নিয়ে নানা ক্ষোভ ও অসন্তোষ তো রয়েছেই।
এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সিনিয়র জেলসুপার সুব্রত কুমার বালা জানান, আমি খুব কড়া মানুষ। আমাকে রাগিয়েন না। ভবিষ্যতে কারাগারে কোনো সাংবাদিক আসলে তাকে কোনো সুবিধা দেওয়া হবে না।
কারাগারের জেলার তারেক কামাল বলেন, আমি দায়িত্বগ্রহণের পর থেকেই সব অনিয়ম দূর করে দিয়েছি। কারা ক্যাণ্টিনে নিম্নমানের বিভিন্ন খাবার সামগ্রী সরবরাহ ও দাম বেশি নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযোগ সঠিক নয়। সাক্ষাতে কথা বলব।
কারা হাসপাতালে টাকার বিনিময়ে সুবিধা দেওয়া হয় এবং কারা অভ্যন্তরে সরকারি ওষুধ ছয়-নয় করা হয় এমন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ফার্মাসিস্ট মাসুদ বলেন, এ ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে কথা বলেন।
জানতে চাইলে কারা হাসপাতালের চিকিৎসক জুবায়ের আলম জানান, আমি ইনচার্জ নই। এ ব্যাপারে নিজের সম্পৃতা অস্বীকার করে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে ইনচার্জ মিজানুর রহমানের সাথে কথা বলেন।
কারা হাসপাতালের ইনচার্জ মিজানুর রহমান জানান, আপনাদের ধারণা ঠিক নয়। হাসপাতালে অসুস্থ রোগীরাই থাকে। কারাগারে আটক ব্যাংক কর্মকর্তা, চাঁপাই, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, চারঘাটসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকার চিহিৃত মাদক কারবারীরা কারা হাসপাতালের ২, ৩, ৪, ৫ নং ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। যদিও তারা সুস্থ। এমন বন্দীদের কেন হাসপাতালে রাখা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অফিসে আসেন। চায়ের দাওয়াত। সাক্ষাতে কথা বলব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.


ফেসবুক পেজ
ব্রেকিং নিউজ